নিউইয়র্কের ভেতরেই এক আলাদা পৃথিবী: হাসিদিক ইহুদিদের অদ্ভুত জীবনযাপন
নিউইয়র্ক—আধুনিক বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর শহর। চারদিকে আকাশচুম্বী ভবন, স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, আধুনিক শিক্ষা ও জীবনযাত্রা। কিন্তু এই আধুনিক শহরের মধ্যেই এমন একটি সম্প্রদায় রয়েছে, যাদের জীবনযাপন দেখলে মনে হতে পারে তারা যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সময়ের পৃথিবীতে বসবাস করছে।
তাদের বলা হয় হাসিদিক ইহুদি (Hasidic Jews)।
তুরস্কের জনপ্রিয় ডকুমেন্টারি নির্মাতা রুহি চেনেটের সাম্প্রতিক ডকুমেন্টারি এই সম্প্রদায়ের জীবনযাপনকে সামনে নিয়ে এসেছে। নিউইয়র্কের ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেও কীভাবে একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় নিজেদের জন্য আলাদা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে—ডকুমেন্টারিটি মূলত সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে।
হাসিদিক ইহুদিরা কারা?
হাসিদিক বা Hasidism হলো ইহুদি ধর্মের একটি অত্যন্ত রক্ষণশীল ও আধ্যাত্মিক ধারার আন্দোলন, যার বিকাশ মূলত ১৮ শতকের পূর্ব ইউরোপে। এর সঙ্গে রাব্বি ইসরায়েল বেন এলিয়েজার—যিনি Baal Shem Tov নামেও পরিচিত—এর নাম বিশেষভাবে যুক্ত।
পরবর্তীতে ইউরোপে বিভিন্ন হাসিদিক গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এসব সম্প্রদায়ের অনেক সদস্য উত্তর আমেরিকায় চলে আসেন। বর্তমানে নিউইয়র্কের বিভিন্ন এলাকায় তাদের বড় বড় সম্প্রদায় রয়েছে।
তাদের জীবনযাত্রার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ধর্মীয় ঐতিহ্য ও নিয়মকে দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে কঠোরভাবে অনুসরণ করা।
আধুনিক প্রযুক্তি থেকে দূরত্ব
ডকুমেন্টারির সবচেয়ে অবাক করা বিষয়গুলোর একটি হলো প্রযুক্তির প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি।
আমরা যেখানে স্মার্টফোন, Facebook, YouTube, TikTok কিংবা ইন্টারনেট ছাড়া কয়েক ঘণ্টা কাটাতেও অস্বস্তি বোধ করি, সেখানে এই সম্প্রদায়ের কিছু সদস্য ইন্টারনেটকে নিজেদের জীবন থেকে অনেকটাই দূরে রাখেন।
ডকুমেন্টারিতে এমন একজন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলা হয়, যিনি জানান যে তিনি জীবনে ইন্টারনেট ব্যবহার করেননি এবং তার দৃষ্টিতে এটি মানুষের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তাদের মধ্যে বিশেষ ধরনের সীমিত-ফিচারের ফোন ব্যবহারের প্রচলনও দেখা যায়।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার—সব হাসিদিক ইহুদি একইভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করেন না। বিভিন্ন গোষ্ঠী ও পরিবারের মধ্যে নিয়মের পার্থক্য রয়েছে।
পোশাকেও আলাদা পরিচয়
নিউইয়র্কের রাস্তায় একজন হাসিদিক পুরুষকে সহজেই আলাদা করে চেনা যায়।
অনেক পুরুষ কালো কোট, কালো টুপি এবং ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরেন। অনেকের পাশের চুল লম্বা রাখা থাকে, যা তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ।
নারীদের পোশাকেও রয়েছে কঠোর শালীনতার নিয়ম। বিবাহিত নারীদের চুল ঢেকে রাখার প্রথা রয়েছে এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীতে এ বিষয়ে আলাদা আলাদা রীতি অনুসরণ করা হয়।
বাইরের পৃথিবীর কাছে এগুলো অস্বাভাবিক মনে হলেও তাদের কাছে এগুলো শুধু পোশাক নয়—ধর্মীয় পরিচয় ও ঐতিহ্যের অংশ।
নিজেরাই তৈরি করেছে একটি ছোট সমাজ
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, নিউইয়র্কে বসবাস করেও তারা অনেকাংশে নিজেদের একটি স্বতন্ত্র সামাজিক কাঠামো তৈরি করেছে।
তাদের নিজস্ব স্কুল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, খাবারের দোকান এবং সামাজিক সংগঠন রয়েছে। কিছু এলাকায় কমিউনিটির নিরাপত্তার জন্য নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবী পেট্রোল ব্যবস্থাও দেখা যায়।
এমনকি জরুরি চিকিৎসা সহায়তার জন্য তাদের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স সেবাও রয়েছে। অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় ও পারিবারিক বিষয় নিষ্পত্তির জন্য ধর্মীয় আদালত বা Rabbinical court-এর ব্যবস্থাও রয়েছে।
তবে এটিকে সরাসরি একটি স্বাধীন “রাষ্ট্রের ভেতর রাষ্ট্র” বলা ঠিক হবে না। তারা যুক্তরাষ্ট্রের আইন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যেই বসবাস করে; বরং নিজেদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবন পরিচালনার জন্য একটি শক্তিশালী কমিউনিটি অবকাঠামো গড়ে তুলেছে।
পরিবার ও সন্তান
হাসিদিক সমাজে পরিবারকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়।
বড় পরিবার তাদের সামাজিক কাঠামোর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। ডকুমেন্টারিতে এমন পরিবারও দেখা যায় যেখানে অনেক সন্তান রয়েছে। সন্তান জন্মদান ও পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কেও ধর্মীয় নির্দেশনা ও রাব্বিদের পরামর্শের ভূমিকা থাকতে পারে বলে সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।
এখানেও অবশ্য পুরো সম্প্রদায়কে একটি নিয়মে বিচার করা উচিত নয়। হাসিদিক ইহুদিদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে পারিবারিক ও ধর্মীয় অনুশীলনে পার্থক্য রয়েছে।
নারী-পুরুষের সম্পর্কেও কঠোর ধর্মীয় নিয়ম
তাদের পারিবারিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ধর্মীয় বিধান।
বিশেষ করে বিবাহিত নারী ও পুরুষের শারীরিক সম্পর্ক, স্পর্শ এবং মাসিকের সময়কার আচরণ নিয়ে Orthodox Jewish tradition-এর মধ্যে নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিধান রয়েছে।
ডকুমেন্টারিতে এসব নিয়মের কিছু কঠোর উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে—যেখানে নির্দিষ্ট সময়ে স্বামী-স্ত্রীর শারীরিক সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার কথা বলা হয়েছে।
বাইরের মানুষের কাছে এটি অত্যন্ত কঠোর মনে হতে পারে। কিন্তু তাদের কাছে এটি ধর্মীয় আইন ও বিশ্বাসের অংশ।
তারা কেন বাইরের পৃথিবী থেকে এতটা দূরে থাকতে চায়?
এই প্রশ্নটাই সম্ভবত পুরো ডকুমেন্টারির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তারা কি আধুনিক পৃথিবীকে ঘৃণা করে?
সবসময় তা নয়।
বরং অনেক হাসিদিক গোষ্ঠীর বিশ্বাস হলো—অতিরিক্ত আধুনিকতা, বিনোদন, ইন্টারনেট ও বাইরের সাংস্কৃতিক প্রভাব তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জীবনযাপনকে দুর্বল করতে পারে।
তাই তারা নিজেদের সন্তানদের এমন পরিবেশে বড় করতে চান যেখানে ধর্মীয় শিক্ষা, পরিবার এবং কমিউনিটি জীবনের গুরুত্ব বেশি।
অর্থাৎ, তাদের বিচ্ছিন্নতা অনেকাংশে একটি সচেতন সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সিদ্ধান্ত।
তাহলে কি তারা সত্যিই “মধ্যযুগে” বসবাস করছে?
ডকুমেন্টারিটি দেখার পর অনেকের এমন মনে হতে পারে।
কিন্তু বাস্তবতাটা একটু বেশি জটিল।
তারা আধুনিক নিউইয়র্কের মধ্যেই বাস করে, আধুনিক অর্থনীতি ব্যবহার করে, ব্যবসা পরিচালনা করে এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন সুবিধাও গ্রহণ করে। একই সঙ্গে তারা নিজেদের ধর্মীয় আইন, পোশাক, শিক্ষা ও সামাজিক নিয়মকে আধুনিক সংস্কৃতির অনেক অংশ থেকে আলাদা রাখে।
অর্থাৎ তারা পুরোপুরি আধুনিক পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; বরং আধুনিক পৃথিবীর ভেতরে থেকেও নিজেদের জীবনযাত্রার জন্য আলাদা সীমারেখা তৈরি করেছে।
সবচেয়ে বড় শিক্ষা: আধুনিকতা আর বিশ্বাসের সংঘর্ষ
এই ডকুমেন্টারির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক সম্ভবত হাসিদিক ইহুদিদের জীবন নয়—বরং একটি বড় প্রশ্ন:
আধুনিক হওয়ার অর্থ কি অবশ্যই নিজের পুরোনো সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে ছেড়ে দেওয়া?
আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি যেখানে প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে প্রতিদিন পরিবর্তন করছে। স্মার্টফোন, AI, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেট আমাদের কাজ, শিক্ষা, সম্পর্ক—সবকিছুর অংশ হয়ে গেছে।
অন্যদিকে হাসিদিক সম্প্রদায়ের একটি অংশ সচেতনভাবেই সেই পরিবর্তনের অনেকগুলো থেকে নিজেদের দূরে রাখছে।
তাদের জীবনযাপন আমাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। আবার তাদের দৃষ্টিতে আমাদের জীবনযাপনও হয়তো অতিরিক্ত উন্মুক্ত, দ্রুতগতির এবং মূল্যবোধের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
সত্যি বলতে, এখানেই ডকুমেন্টারিটির আসল আকর্ষণ।
এটি শুধু “একটি অদ্ভুত সম্প্রদায়ের গল্প” নয়। এটি আমাদের সামনে প্রশ্ন রাখে—
আমরা প্রযুক্তির সুবিধা নিচ্ছি, নাকি প্রযুক্তি ধীরে ধীরে আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছে?
আমরা স্বাধীনভাবে জীবন বেছে নিচ্ছি, নাকি সমাজের স্রোতে ভেসে যাচ্ছি?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
একটি সম্প্রদায় তার বিশ্বাস ও ঐতিহ্য রক্ষা করতে আধুনিক পৃথিবী থেকে কতটা দূরে যেতে পারে?
নিউইয়র্কের ব্যস্ত শহরের মাঝখানে হাসিদিকদের এই জীবন তাই শুধু কৌতূহলের বিষয় নয়। তারা মনে প্রানে অপেক্ষা করছে তাদের মাসিহা আসবে তাদের জন্য নতুন পৃথিবী সাজাবে। অসভ্য একটা জাতি নিজেদের কিভাবে সভ্য হিসাবে প্রেজেন্ট করে রেখেছে আর অন্যদিকে মুসলিমরা জাস্ট এদের গোলামি করে যাচ্ছে।
বিস্তারিত ডকুমেন্টরি লিংকঃ https://www.youtube.com/watch?v=l6UtZ-u9CyM